আক্বীদাভ্রষ্ট ওহাবী - আহলে হাদীস জাতির জন হুমকি!
আক্বীদাভ্রষ্ট ওহাবী - আহলে হাদীস জাতির জন হুমকি!
লেখক গবেষক :
মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল মান্নান
ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামে রয়েছে সৃষ্টির কল্যাণের যাবতীয় শিক্ষা। মানুষের ইহ ও পরলৌকিক সাফল্য ও শান্তির যাবতীয় দিকনির্দেশনা রয়েছে এ পূত-পবিত্র ধর্মে। ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর প্রকৃত অনুসারীরা এর বাস্তবতাও প্রমাণ করেছেন। ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রকৃত আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। পক্ষান্তরে সতর্কও করে দিয়েছেন এ আদর্শ থেকে বিচ্যুতদের বিভিন্ন অপকর্ম সম্পর্কে। সিহাহ্ সিত্তার এক বিশুদ্ধ হাদীসে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন- “বনী ইস্রাঈল বাহাত্তর দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছিল কিন্তু আমার উম্মত বিভক্ত হবে তিয়াত্তর দলে'। তন্মধ্যে তিনি একটি মাত্র দলকে সঠিক ও নাজাতপ্রাপ্ত বলে উল্লেখ করেছেন। হাদীস ও আক্বাঈদ বিশারদগণ ওই হাদীস শরীফকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তাতে এ কথাই সুস্পষ্ট হয় যে, ওই সঠিক নাজাতপ্রাপ্ত দলটি হচ্ছে 'আহলে সুন্নাত' বা 'সুন্নী' জামা'আত। ওই সুন্নী জামা'আতের বাইরে অবশিষ্ট বাহাত্তর দলের কয়েকটা প্রাচীন দল হচ্ছে ওহাবী ও আহলে হাদীস ইত্যাদি। 'ওহাবী' হচ্ছে সৌদী আরবের মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহাব নজদীর অনুসারী দল, আর তারই আরেক অনুসারী দল হচ্ছে 'আহলে হাদীস'। এ শেষোক্ত দলটিও ইবনে আবদুল ওহাবের অনুসারী। তাও এ জন্য যে, মূলতঃ ইবনে আবদুল ওহাব ছিল 'লা-মাযহাবী' (মাযহাবের ইমামদের অমান্যকারী, ভ্রান্ত মতবাদী)। ওহাবী মতবাদ প্রচারের সূচনালগ্নে ইবনে আবদুল ওহাবের ইঙ্গিতে তার অনুসারী ও প্রচার করা হাম্বলী-শাফে'ঈ ইত্যাদি মাযহাবের অনুসারী বলে নিজেদের পরিচয় দিলেও আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থানকে মজবুত করে নেয়ার পর তারা তার আসল লা- মাযহাবী ভাবধারাকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস চালায়। সৌদী ওহাবীরা প্রথমে নিজেদেরকে 'ওহাবী' কিংবা 'লা'মাযহাবী' বলে প্রকাশ করতে সঙ্কোচ বোধ করতো; পরবর্তীতে নিজেদেরকে ‘সালাফী' বলে পরিচয় দিতে থাকে এবং মাযহাব বিরোধী প্রচারণাকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যায়। বর্তমানে তারা নিজেদেরকে সরাসরি 'ওহাবী' পরিচয় দিতে ও মাযহাবের বিরুদ্ধে কথা বলতে মোটেই দ্বিধাবোধ করছে না। আর সৌদিয়ার বাইরে বিশেষ করে পাক-বাংলা-ভারত উপমহাদেশে ওই ওহাবীদের একটি দল ‘মাযহাব নয়, হাদীসই যথেষ্ট' শ্লোগান নিয়ে নিজেদের 'আহলে হাদীস' বলে পরিচয় দিতে থাকে; আর মাযহাব বিরোধী অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতে ‘আহলে হাদীস' নামে সংগঠনও প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের 'আহলে হাদীস'রা প্রাথমিক পর্যায়ে নিছক নিজস্ব আক্বীদা ভিত্তিক সম্প্রদায় হিসেবে সীমিত থাকলেও বর্তমানে তারা এ দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলেরও স্বপ্ন দেখছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাদের এ অর্থ ও পরিকল্পনা সংগ্রহ ও আমদানীর জন্য গ্রেফতারকৃত ও কারারুদ্ধ ড. গালিবের, আরবের বিভিন্ন ধণাঢ্য রাষ্ট্রে অবস্থিত আস্তানার কথাও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত
![]() |
হয়েছে। দেশেও তাদের বিভিন্ন ঘাঁটি, ধ্বংসাত্মক ও নাশকতামূলক কর্মকান্ড আজ দেশবাসীর
নিকট অস্পষ্ট নয়।
বাকী, 'ওহাবী' নামের সম্প্রদায়টিও তাদের কর্মতৎপরতাকে এখন তাদের আক্বীদা ভিত্তিক অবস্থানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেনি। দেশের রাজনৈতিকপরিমণ্ডলে এখন তারা দেশের শাসন ক্ষমতার স্বপ্ন দেখছে। বলাবাহুল্য, আরব বিশ্বের ওহাবী ধণাঢ্য দেশ ও ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে তারা নিছক ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করেছে ও করছে। দেশে তাদের ভাবধারার বহু (ওহাবী) মাদ্রাসা, হিফ্যখানা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন র'য়ে এগুলোতে ভারতের দেওবন্দী ও সৌদিয়ার ওহাবী ভাবধারায় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এগুলোতে বেশ কয়েক যুগ থেকে। ইসলামী অঙ্গণে নিছক সংখ্যালঘু এ সম্প্রদায়টি বিভিন্ন সুপরিকল্পিত পন্থায় আজ এক মারাত্মক পর্যায়ে ও অবস্থানে পৌঁছেছে এবং ক্রমশঃ দেশ ও জাতির জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ওহাবীরা তাদের অবস্থানকে দৃঢ়তর করার জন্য দু'ধরণের পলিসি অবলম্বন করেছে ঃ ১. ধর্মীয় ও ২. রাজনৈতিক। তারা আক্বীদা ও আমলগতভাবে ‘ওহাবী ’ সৌদিয়ার ইবনে আবদুল ওহাব নজদীর অনুসারী) ও ভারতের দেওবন্দী ওহাবীদের ভাবশিষ্য; কিন্তু তাদের প্রচারণা, কথাবার্তা ও কর্মপন্থার নামকরণে তারা ওহাবী ও দেওবন্দীর নাম-গন্ধও প্রকাশ করে না। তাদের মাদ্রাসাগুলোর নামে 'ইসলামী' ও 'আরবী' ইত্যাদি থাকে অনিবার্যভাবে। টঙ্গীতে বার্ষিক বিরাট ‘তাবলীগী জামায়েত'কে 'ওহাবী সম্মেলন' নাম না দিয়ে সেটাকেও ইসলামের নামে চালিয়ে দিচ্ছে।
গোটা উপমহাদেশে আ'লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, বাংলাদেশে আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটী, আল্লামা গাজী সৈয়দ মুহাম্মদ আযিযুল হক শেরে বাংলা, আল্লামা আবিদ শাহ্ মুজাদ্দেদী আলায়হিমুর রহমাহ্ এবং সুন্নী ওলামা- মাশাইখ শুরু থেকেই ওই ওহাবিয়াতকে চ্যালেঞ্জ করে এসেছেন। আরব বিশ্বে এবং বিশ্বের অন্য দেশগুলোতেও সুন্নী ওলামা-মাশাইখ ওহাবিয়াতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করেন, ওয়াজ-বক্তৃতা লেখনী চালিয়ে যান এবং সুন্নী দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু সৌদিয়া ও আরবের অন্য রাষ্ট্রগুলোতে প্রকৃত সুন্নী ওলামা-মাশাইখের কণ্ঠকে একেবারে রোধ করে দেয়া হয় রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে সুন্নী মুসলমানদের ওহাবী বিরোধী প্রচারণাও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে জোরদার হচ্ছে না।
এ উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। মোটকথা, সুন্নী-মুসলিম সাধারণ, ওলামা-মাশাইখ ও সংস্থাগুলোর দুঃখজনক নীরবতা, আত্মঘাতী অনৈক্য ও প্রচারণার আশঙ্কাজনক দৈন্যতা ইত্যাদি অনিবার্য কারণে একদিকে সুন্নী মতাদর্শের তৎপরতা দেশের কয়েকটা খাঁটি সুন্নী মাদ্রাসা এবং কতিপয় খাঁটি আক্বীদাভিত্তিক খানকাহ্ ও সংগঠনের সীমিত কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়; অন্যদিকে ওহাবী মতবাদী সংস্থা-সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও পরিকল্পিত তৎপরতা অব্যাহত গতিতে চলতে


No comments