মাইজভান্ডারী দর্শন কী?
মুফতী -এ আজম হযরত মওলানা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) মাইজভান্ডারী দর্শন ও ছেমার স্বীকৃতি
শাহজাদা মৌলভী সৈয়দ লুৎফুল হক(রহ:)
ফরহাদাবাদ দরবার শরীফ, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
মানুষের চিরশত্রু পাপাত্মা শয়তানের প্ররোচনায় এ দুনিয়াতে আদম সন্তানগন যখন ভোগ আত্মার অধীন হয়ে পার্থিব কামনা বাসনাকে প্রাধান্য দিয়ে আল্লাহর, সোজা ও সরল পথ থেকে দূরে সরে যায়, প্রকৃত খোদার উপাসনা ত্যাগ করে, শয়তানের মিথ্যা প্ররোচনায় নানারূপ কুসংস্কার পূর্ণ কাজ কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তখনই মহান রাব্বুল আলামীন মানুষের হেদায়েত ও পরিত্রাণের জন্য যুগে-যুগে, দেশে-দেশে, নবী-রসুলগনকে সংস্কারক হিসেবে এ ধরাধামে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ পাক এ ধরাধামে অনেক নবী প্রেরণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী আহমদ মোজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে, আল্লাহতা'লা তৎকালীন আরবে আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে পাঠিয়েছিলেন। কারণ তৎকালীন গোটা বিশ্বের মানুষ। বিশেষ করে আরব সমাজ পঙ্কিলতার চরম নিম্নস্তরে উপনীত হয়েছিল। তাঁর পূর্বে অন্যান্য নবী রাসুলগণ কোন গোত্র কিংবা সম্প্রদায় বিশেষের পথ প্রদর্শক হিসেবে। প্রেরিত হয়েছিলেন কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (দঃ) প্রেরিত হয়েছিলেন গোটা বিশ্বের মানবজাতির হেদায়ত ও কল্যাণের জন্য, তাই তিনি গোটা বিশ্বজগতের জন্য রহমত বা আশীবাদ স্বরূপ। তিনি আল্লাহতা'লা হতে দু 'প্রকার খোদায়ী শক্তি প্রাপ্ত হয়েছিলেন যথা নবুয়তী শক্তি এবং বেলায়তী শক্তি, নবুয়তী শক্তি বলে তিনি ইসলাম নামক সেরা শান্তির ধর্ম প্রচার করে, অন্ধকারে নিমজ্জিত মানব জাতিকে সত্যের ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করেন। এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) মাধ্যমে নবুয়ত শ্রেষ্ঠত্ব ও পূর্ণতা লাভ করেন।
তাঁর অপর শক্তিটি হল বেলায়তী শক্তি। এই বেলায়তী শক্তি হল আল্লাহতা'লার নিকটতম রহস্যপূর্ণ সম্পর্ক ও ক্ষমতা, যাকে বেলায়তে এহছান বলে। তিনি এই দুইটি খোদায়ী নেয়ামত প্রাপ্ত হয়ে আল্লাহতা'লার প্রিয়তম মাহ-বুব নামে আখ্যায়িত ও মেরাজ মিলনে মুক্তদীদার লাভকরেছিলেন। অতএব, তাঁর সত্ত্বায় নবুয়ত ও বেলায়ত দুইটিই পরিপূর্ণতা লাভ করে। তারপর আর কোন নবী আসবেন না এবং আসার প্রয়োজনও নেই, কিন্তু বেলায়তে এহছান আবহমানকাল পর্যন্ত জারী থাকবে। তিনিই হলেন
মোহাম্মদী নবুয়ত নীতিধারী আহমদী বেলায়ত শক্তিবাহী বিজয়ী প্রথম মাহবুব। তাঁরই বদৌলতে সুপথ ও রহস্যপথ আবিষ্কৃত হয়ে গেল। তাই রেছালত ও নবুয়ত চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো। উন্মক্ত রইল শুধু আহমদী শক্তিতে উদঘাটিত তাঁর একত্ববাদে মিলনের পথ। এটাই হল দ্বীনে ইসলাম, এবং পবিত্র কুরআনের মূল রহস্য ও প্রধান উদ্দেশ্য। সুপথ ও রহস্যপথ আজ আবিস্কার ও নির্দেশিত হয়ে গেল এবং আধ্যত্মিক ক্ষমতা, বেলায়ত পদ্ধতির প্রাধান্যতা স্বীকৃত হলো।
নবী করিম (দঃ) এর সাহচর্য প্রাপ্ত ছাহাবাগণ ত্রিবিধ ধারায়, নবী করিম (দঃ) এর ফয়েজ, বরকত লাভকরেছেন বলে উল্লেখ আছে। যথা- (১) ত্বরীকায়ে আবরারে মোজাহেদীন, (২) ত্বরীকায়ে আখিয়ায়ে ছালেহীন এবং ৩। ত্বরীকায়ে শোহাদায়ে আশেকীন। এই ত্রিবিধ বেলায়তী ধারা, হযরত রাসুলুল্লাহ (দঃ) এর ওফাতের পর অলিয়ে কামেলদের মাধ্যমে স্বাভাবিক ভাবেই প্রচলিত থাকে। সর্বপ্রকার বেলায়ত ইমামুল আউলিয়া হযরত আলীর (কঃ) ব্যক্তিত্বে কেন্দ্রীভুক্ত হয়, কেননা হিযরতের সময় তিনিই রাসুলুল্লাহর (দঃ) বিছানায় চাঁদর মোবারক আপাদমস্তক ঢেকে শুয়ে নিজ প্রাণ উৎসর্গ করতঃ প্রেম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং রসুলে করিমের আধ্যাত্মিক বেলায়তী শক্তি যা নবুয়তে সুপ্ত ছিল তা হযরত আলীর (কঃ) জাতে পাকে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এবং তিনি রসুলে করিমের আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী হয়েছিলেন, যা নবী করিমের নিম্মোক্ত বাণী হতে প্রমাণিত হয়, যেমন নবী করিম (দঃ) এর বানী (১) আমি এলমের শহর এবং আলী ইহার দরজা, (২) আমি যার মণ্ডলা (প্রেমাস্পদ) হই আলীও তার মওলা। বেলায়তী ধারায় বিশ্বের লক্ষ কোটি নর-নারী নিজ নফছাক্রান্ত আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহপাকের প্রেমরাহে অগ্রসর হতে থাকেন এবং খোদায়ী নেয়ামত অর্জন করে, সফলকাম হয়ে থাকেন। এবং যুগে যুগে অলিয়ে কামেলদের বেলায়েতী ধারা জারী আছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে হযরত নবী করিম (দঃ) এর
সহচার্য্য প্রাপ্ত ছাহাবাগণ, তাঁদের উত্তরাধিকারী (তাবেইন) এবং তাঁদের পরবর্তী লোকেরা (তাবে-তাবেইন), মহানবী(দঃ) কে পুরোপুরিভাবে অনুস্মরণ ও অনুকরণ করতেন দুনিয়াবী ক্ষণস্থায়ী ভোগ বিলাস, পরিহার করে চিরস্থায়ী পরলৌকিক সুখ-শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে, তাঁরা আল্লাহ পাকের উপাসনায় আর কাউকে শরীক করতেন না। তাঁরা নিবিলাস জীবন যাপন করতেন। তাঁরা পরকালকে ইহকালের উপরেই প্রাধান্য দিতেন। ধন-সম্পদ বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা, লোভ-লালসা এবং বাসনা-কামনা তাঁদের মধ্যে ছিল না, বললেই চলে। তাঁরা আত্মশুদ্ধির জন্য নবী করিম (দঃ) এর ত্বরিকা মোতাবেক একাগ্রচিত্তে ইবাদত বন্ধেগীতে লিপ্ত থাকতেন। তাঁদের মধ্য হতে কিছু সংখ্যক আরববাসী ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে পূর্ব এশিয়ার দিকে গমনকালে আমাদের দেশে, বিশেষ করে চট্টগ্রামে সাময়ীক যাত্রা বিরতি করেছেন বলে জানা যায়। সে সময়ে যাত্রাবিরতিতে তাঁরা এখানেও ইসলাম প্রচার করে গিয়েছেন তা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সাথে আরবী ভাষার সংমিশ্রনে পরিস্কার ভাবে বুঝা যায়। তদুপরি চট্টগ্রামকে 'গেইট অব ইসলাম' বলার মধ্যেই তার যথার্থতা নিহিত। পবিত্র আরব ভূমি ও তার নিকটতম অঞ্চল থেকে মহান অলিয়ে কামেলগণ বিভিন্ন ভাবে বিভক্ত হয়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এদেশে আগমন করেছিলেন। অলিয়ে কামেলগণ বিভিন্ন ভাবে, প্রথম ভাগে যারা আগমন করেছেন তাঁদের মধ্যে মুন্সিগঞ্জ জেলার শাহজান পুরে হযরত মখদুম শাহ দৌলাহ (রহঃ) প্রমুখ অন্যতম। দ্বিতীয় পর্যায়ে যাঁরা ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ দেশে আগমন করেছেন, তাঁদের মধ্যে সিলেট শহরে হযরত শাহজালাল ইয়ামেনী (রহঃ) ও তাঁর সংগী সাথীগন, রাজশাহী বিভাগীয় শহরে হযরত শাহ মখদুম (রহঃ) খুলনা বিভাগীয় সদর সংলগ্ন বাগেরহাট জিলায় হযরত খান জাহানআলী (রহঃ), চট্টগ্রামে সোলতানুল আরেফিন বাইজীদ বোস্তামী (কঃ) ও বার আউলিয়া সহ অনেক অলি দরবেশ, আরব ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেক মুসলিম মনিষীগন এ দেশে আগমন করে, ধর্ম প্রচার করেছেন। তেমনি কয়েকশত বছরের ইতিহাসে এ দেশে জন্মগ্রহন করেছেন এমন মহান দ্বীনি আলেমগন ও ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্য তাঁদের চেষ্টাকে নিয়োজিত করে গিয়েছেন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের ইতিহাসে শরীয়ত ও ত্বরিকত সমান্তরালভাবে সামনে রেখে ইসলাম ধর্মের প্রচার প্রসারে, ও বাতেলপন্থীদের কুরআন ও হাদীসের অপব্যাখ্যা এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করে গিয়েছেন এমন কয়েকজন ব্যক্তিত্বের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ সৈয়দ বংশের যুগশ্রেষ্ঠ আলেম জাহেরী ও বাতেনী জ্ঞানের ভান্ডার আল্লামা সৈয়দ মছিহউল্লাহ
মির্জাপুরী (কঃ) অন্যতম। তিনি এদেশে জন্মগ্রহন করে থাকলেও তাঁর পূর্বপুরুষগণ সুদূর আরব দেশ থেকে এদেশে আগমন করে দ্বীন ইসলামের খেদমতে রত ছিলেন। নিঃসন্দেহে তিনি বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) এর পবিত্র বংশদ্ভূত। তিনি সৈয়দ বংশজাত বলেই, গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী (কঃ) তাঁকে সৈয়দ সাহেব বলে আখ্যায়িত করতেন। হযরত আকদছের একমাত্র পুত্র হযরত মৌলভী শাহছুফী সৈয়দ ফয়জুল হক (কঃ) এর সাথে আল্লামা শাহছুফী সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) প্রকাশ বড় মৌলভী সাহেবের কন্যার। পরিনয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ায়, তাঁদের উচ্চ বংশ মর্যাদার ইংগিত বহন করেন।
ইসলামে দুই প্রকার এলমের গুরুত্ব স্বীকৃত হয়েছে, যথা (১) এলমে জাহের অর্থাৎ শরিয়ত ও (২) এলমে বাতেন অর্থাৎ মারেফাত বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান। হাদিস শরীফে উক্ত 'তলবুল এলমে ফরিজাতুন' এর ব্যাখ্যায় এই দুই প্রকার এলেমকেই বুঝানো হয়েছে। আল্লামা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) সাহেব, এ দুই প্রকার এলমই অর্জন করেছেন।
এলমে জাহের অর্থাৎ জাহেরী ধর্মীয় শিক্ষা দীক্ষার ব্যাপারে আল্লামা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) এর প্রাথমিক আরবী ও বাংলা শিক্ষা মক্তব থেকে শুরু হয়। তিনি বাল্যকালীন ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর চট্টগ্রামে উচ্চ ধর্মীয় শিক্ষার কোন ব্যবস্থা না থাকায়, উচ্চ ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে কলিকাতার সুপ্রসিদ্ধ আলীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে উক্ত মাদ্রাসার শেষ পরীক্ষায় ইলমে কোরআন, ইলমে হাদীস, উসুলে হাদীস, ফিকাহ (সব মাজহাবের) উসুলে ফিকাহ, তাফসীর, মোনতেক, হেকমত, বালাগাত, আকায়েদ, ফালছফা ও ফরায়েজসহ প্রভৃতি ধর্মীয় শাস্ত্রে তিনি গভীর জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে সাফল্যের সাথে পাশ করেন। তাঁর ছেলে মওলানা শাহছুফী সৈয়দ ফজলুল বারী (রঃ) আমার নানা হন। তিনি বলতে শুনেছি যে কলিকাতায় পাঠ্য অবস্থায় তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা আল্লামা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) সাহেব মাদ্রাসা থেকে বার্ষিক আশি টাকা বৃত্তি পেতেন অতএব এতে বুঝা যায়, পাঠ্য অবস্থায় তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। জাহেরী দ্বীনিএলম শিক্ষা সমাপ্তির পর আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে হযরত আল্লামা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) কলিকাতায় সুপ্রসিদ্ধ অলি, হযরত গাউছে কাওনাইন শায়খ সৈয়দ আবু শামা মোহাম্মদ ছালেহ আলকাদেরী লাহোরী (কঃ) এর সহচার্যে গিয়ে দস্তে বায়াত হয়ে খোদায়ী নেয়ামত হাছেল করত ||
দেশের বাড়ীতে ফিরে আসেন। তিনি আরবী, ফার্সী, উর্দুও বাংলা ভাষায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ইসলামের জটিল বিষয়াবলীর উপর তাঁর ফতোয়া প্রণয়নে দক্ষতা, ফরায়েজ, ফার্সী, উর্দু, ও আরবী গদ্য ও পদ্য রচনা লিখন পদ্ধতির দক্ষতা এবং ধর্মীয় মোনাজারায় নেতৃত্ব ইত্যাদি দেখে তাঁর সমসাময়িক আলেমগণ তাঁকে যোগ্য মর্যাদা দিতে লাগলেন এবং আলেম সমাজ ও জনসাধারনের নিকট তিনি বড় মওলানা ছাহেব হিসেবে পরিচিতি লাভকরেন। তিনি চট্টগ্রাম শহরের সরকারী মোহছেনীয়া মাদ্রাসার মোদারেছ নিযুক্ত হয়েছিলেন। এ বিষয়ে বেলায়তে ওজমার অধিকারী দুরদর্শী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সম্পন্ন গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী মওলানা শাহছুফী সৈয়দ আহমদউল্লাহ (কঃ) তাঁকে কেন্দ্র করে একটি কারামত ও সংঘটিত হয়েছিলেন।
আল্লামা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) সাহেবের ছেমা তথা আধ্যত্মিক সংগীতে সমর্থন ঃ- গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী হযরত মওলানা শাহছুফী সৈয়দ আহামদ উল্লাহ (কঃ) বেলায়তের উজ্জ্বল প্রদীপ নিয়ে যখন এই বিশ্বে প্রকাশিত হলেন, অসংখ্য মানুষ পতংঙ্গের ন্যায় তাঁর সুশীতল বেলায়তের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহনে অবনত মস্ত কে উক্ত ফজীলতে রব্বানী হাছেল করতে লাগলো। ছিফাতে বশরীর বিদূরতা পূর্বকঃ হিজাবে জোলমাতী অপসারনে, তজকীয়ায়ে নফছ ও হায়াতে কুল্লীর উদ্দেশ্যে হালকা জজবার মজলিশ করতঃ বাদ্যযন্ত্র সহকারে আল্লাহ, রাসুল, পীর, মোর্শেদের প্রশংসায় আধ্যাত্মিক গানগীতি পাঠ ও জিকিরে জলী সহকারে অজদ করতে আরম্ভ করলেন যা মাইজভান্ডারী ত্বরিকার এক বিরাট অবদান। অল্প সময়ে দেহ অভ্যন্তরে লতিফা সমূহে, বিদ্যুৎত্ময় গতিতে ফয়েজ বরকতের আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং ওরুজে রূহানীয়তে বিশেষ ফলপ্রসু। মাইজভান্ডারী আশেক ভক্তদের মজলিশে হালকা জজবা অজদ দেখতে গিয়ে নিজেও জজবাতের অধিকারী সম্পন্ন হন। খোদা পরিচিতি জ্ঞানহীন কতেক ভাষাবিদ আলেম উহা দর্শনে ইনকার করতঃ শরীয়ত বিরোধী, আল্লাহ, রসুলের খিলাফ, হারাম, বিদাত ইত্যাদি আখ্যা দিতে লাগলেন এবং মানুষকে খোদায়ী প্রদত্ত আলো থেকে বঞ্চিত করার প্রয়াসে চেষ্টা করতে লাগলেন।
ইহা দেখে বাংলা, পাক ভারত উপমহাদেশের শীর্ষ স্থানীয় আলেমগণ গাউছুল আজম মাইজভান্ডারীর এত্তেহাদী ফয়েজ প্রাপ্ত বিশিষ্ট খলিফা, ইসলামী বিধান শাস্ত্র বিশারদ মুফতী আল্লামা সৈয়দ আমিনুল হক ফরহাদাবাদী (কঃ) মানবের উপকার সাধনে "তোহফাতুল আখইয়ার ফি দাফ-ইশারায়াতিল আশরার" নামক একখানা কিতাব
১৬
পূর্ববর্তী বুজুর্গানেদ্বীনের কিতাব, আল-কোরআন ও হাদীসের অকাট্য দলিলাদি সংগ্রহ করে 'ছেমা' তথা আধ্যাত্মিক সংগীত ও সজিদায়ে তাহিয়্যাহ যায়েজ সর্ম্পকে প্রামান্য দলিলাদি লিপিবদ্ধ করেন। উহার মকবুলিয়তের জন্য তাঁর পীর, গাউছুল আজম মাইজভান্ডারীর খেদমতে পেশ করেন। তিনি ইহা শুনে আনন্দিত হন এবং আল্লাহ তা'লার দরবারে মোনাজাত ও দোয়া করেন। এবং উক্ত কিতাবে দস্তখত করেন (বেলায়াতে মোতালাকা দ্রঃ)। গ্রন্থকার আল্লামা সৈয়দ আমিনুল হক ফরহাদাবাদী (কঃ) ফতোয়া আকারে এই কিতাব খানা বাংলা ১৩১৩ সালে রচনা করেন। তৎকালীন শ্রেষ্ট ওলামায়ে কেরাম ইহা সুষ্ঠ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাক্ষর দান করেছেন, স্বাক্ষরদানকারীদের মধ্যে ১ নং স্বাক্ষরদানকারী হচ্ছেন, হযরত মওলানা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) প্রকাশ বড় মওলানা সাহেব অতএব ইহা পরিস্কার প্রমান করে যে, 'ছেমা' তথা আধ্যাত্মিক সংগীতে এবং সজিদায়ে তাহিয়্যার ব্যাপারে তাঁর সম্মতি ছিল। আল্লামা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী সাহেব যেই ধরনের 'ছেমা' দায়েম রাখতেন। নিম্নে তার কিছু আবাস দেওয়া গেল।
অন্তরে আল্লাহর প্রেম, কিংবা কোন সৎ খেয়াল বা সদাআসক্তি গোপন থাকলে 'ছেমা' বা আধ্যত্মিক সংগীত উক্ত সম্ভার গুলোকে সরল ও সতেজ করে তোলে। এ জাতীয় 'ছেমা' চারি শ্রেনীতে বিভক্ত যা 'কিমিয়ায়ে সাহাদৎ' গ্রন্থে বর্নিত আছে।
প্রথমতঃ কাবা শরীফের মাহাত্মা হজ্ব যাত্রার কাহিনী। সম্বলিত হজ্বের কবিতা। এরূপ 'ছেমা' শ্রবনে শ্রোতার অন্ত রে বায়তুল্লাহ শরীফ জিয়ারত করার আকাংখা জাগ্রত হয় এবং হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আর ধর্ম যোদ্ধাদের অন্ত রে জিহাদের প্রেরনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যুদ্বাৎসাহ বর্ধক বীরত্বগাথা এবং বাদ্যবাজনা জায়েজ। কেননা এ শ্রেনীর গান বাদ্য মানুষকে আল্লাহর প্রেমে উদ্বুদ্ধ করে শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার এবং ইসলাম ধর্ম রক্ষার্থে প্রাণ বিসর্জন দেয়ার জন্য অনুপ্রানিত ও উৎসাহিত করে তোলে। ইহা বিরাট পুন্যের কাজ।
দ্বিতীয়ত: অনুশোচনা ও অনুতাপ বর্ধক 'ছেমা' শ্রবনে শ্রোতার মনে ভুল ত্রুটি ও পাপের জন্য অনুতাপের ঝড় সৃষ্টি হয় এবং ধর্মকর্মের মর্যাদা লাভে ও আল্লাহ তা'আলার প্রসন্নতা লাভে বঞ্চিত হওয়ার অনুশোচনার ক্ষোভ উথলিয়া চক্ষু হতে নির্জরে অশ্রু বন্যা প্রবাহিত হয়। এরুপ 'ছেমা' শ্রবনেও বিশেষ পূণ্য হয়।
তৃতীয়তঃ যে সমস্ত বিষয়ে আনন্দিত হওয়া শরীয়ত অনুযায়ী জায়েজ তদ্রুপ কোন আনন্দ অন্তরে বিদ্যমানথাকলে তা বিকাশ করার জন্য আনন্দবর্ধক 'ছেমা' শ্রবন। করা বৈধ এবং মংগলজনক। যেমন: বিবাহ উৎসবে, ওলীমা, জিয়াফতের উৎসবে, ছেলে ভুমিষ্ট হলে, আকীকা উৎসবে, খখনা করণে কিংবা বিদেশ হতে বন্ধু বা আত্মীয় স্বজনের প্রত্যাবর্তনে আনন্দোৎসব করা জায়েজ। কারণ উক্ত অনুষ্ঠানে 'ছেমা' বা রাগ-গান খুশী-হাসি প্রস্ফুটিত করার জন্য হয়ে থাকে। সেই কাজে খুশী করা জায়েজ তা বিকাশ করাও জায়েজ বটে। ইহার প্রমান স্বরূপ উল্লেখ করা যায় হযরত রসুল্লল্লাহ (দঃ) যখন তাঁর জন্মভূমি মক্কা শরীফ হতে হিজরত করে মদীনায় আগমন করেন, তখন মদীনা বাসীরা 'দফ' বাজিয়ে রাগসুরে তাঁর সামনে নিম্নোক্ত কবিতাটি গেয়ে গেয়ে আনন্দোৎসব করেছিল এবং তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
'তালায়াল বদরু আলাইনা মিন ছানাইয়াতিল বিদায়ী ওয়া-জাবাশ শোকরা আলাইনা- মাদা আলিল্লাহ হিদায়ী'।
অর্থাৎ শান্তিপথের অগ্রদূত শান্তিময় পূর্ণচন্দ্র শান্তিপথ বাহিয়া আজ আমাদের ভাগ্য আকাশে উদয় হয়েছে। তাই আমাদের উপর আল্লাহর শোকর গুজারী করা ফরয হয়ে গড়েছে।
অনুরূপভাবে উপরোক্ত অনুষ্ঠান গুলিতে এবং আউলিয়া কেরামদের ওফাত দিবসে ওরশ শরীফে 'ছেমার' ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
চতুর্থতঃ 'ছেমা' বা রাগ-গানই মূল বস্তু। কারো অন্তরে আল্লাহ তা'আলার প্রতি মহব্বত প্রবল হয়ে প্রেমের স্তরে উন্নীত হলে তার পক্ষে 'ছেমা, অর্থাৎ নির্দোষ মুর্শেদী গজল ও গান শ্রবন করা অবশ্য কর্তব্য। গতানুগতিক সৎকার্য অপেক্ষা গান গজল ইত্যাদি শ্রবনই তাঁদের পক্ষে অধিকতর ফলদায়ক হয়ে থাকে। বস্তুতঃ যে কাজের দ্বারা আল্লাহ পাকের প্রতি মহব্বত বৃদ্ধি পায় সে কাজের সওয়াব অবশ্যই অধিক। এ কারনেই ছুফিগণ, 'ছেমা' শ্রবণ করেন। আল্লাহ তা'আলার প্রেমের আগুন অন্তরে প্রজ্জলিত করার জন্য মারফতী 'ছেমার' ক্ষমতা অসীম ও অতুলনীয়। সূফীদের মধ্যে এমন সূফী ও আছেন 'ছেমা' এমন এক অনির্বচনীয় সুখস্বাদ উপভোগ করে থাকেন যা 'ছেমা' ভিন্ন অপর কোন বস্তুর সাহায্যেই ভোগ করার উপায় নেই। সেই মোহমত্ত অবস্থায় এই ছেমারই প্রভাবে তাঁদের অন্তরে যে সমস্ত সুক্ষ্মানুসূক্ষ্ম অবস্থা পায় তাকে সূফী পরিভাষায় 'ওয়াজদ' বা ছেমাজনিত মোহমত্ততা বলে থাকেন। ওয়াজদের প্রকৃত অবস্থা এই যে, একখন্ড রৌপ্য আগুনে পোড়াতে থাকলে অগ্নিশিখা উহাকে গলিয়ে যেমন পরিস্কার ও উজ্জ্বল করে তোলে, তদ্রুপ ছেমার স্বললিত তান এবং বাদ্যযন্ত্রের সুমধুর ঝংকার অন্তরে প্রবেশ করে
উহাকে স্বচ্ছ ও পবিত্র করে তোলে। ছেমার সৃষ্টি সুর অন্ত রের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে তন্মধ্যস্থিত সর্বাধিক খারাবীকে দন্ধিভূত করে দেয়।
উপরে ছেমার বা আধ্যাত্মিক সংগীতের বর্নণা দেওয়া হল এই ধরনের 'ছেমা' বা সংগীতেই আল্লামা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) সাহেব যা সমর্থন করতেন।
কেননা আধ্যত্মিক সংগীত বা ভক্তি মূলক গানবাজনা শ্রবণ করা রসুলে করিম (দঃ) এর সুন্নতের একেবা বা অনুস্মরণ হিসেবে নিঃসন্দেহে হালাল ও মোবাহ। কেননা এত্তেবা বা অনুস্মরণের জন্যে আদেশের অপেক্ষা করতে হয় না। সুতরাং যে সমস্ত মুফতীগণ দেশকে তথা সংগীতকে সাধারণভাবে হারাম বলেছেন এবং কোরআন ও হাদীসের দ্বারা হারামের দলিল পেশ করেছেন, সবগুলিই কথিত অসৎ উদ্দেশ্যের জন্যই। আর যে সমস্ত মুফতীগণ সাধা-রনভাবে 'ছেমা' হালালের দলিল দিয়েছেন তা সৎ উদ্দেশ্যের উপরই নিহিত। ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, ওলামা ও বজুর্গানেদ্বীন হতে 'ছেমা' শ্রবণের যে বর্নণা পাওয়া যায় সবই সৎ উদ্দেশ্যে এবং সৎ নিয়তের উপরই নিহিত। অতীত ও পরবর্তী ওলামাগণের ছেমার প্রতি ইনকারের যে বর্নণা আছে তা অসৎ উদ্দেশ্যে ছেমা শ্রবনের ব্যাপারেই প্রযোজ্য।
আল-কোরানে আল্লাহতালা এরশাদ করেছেনঃ হে নবী আপনি বলে দিন, 'এই মানবকুল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবেসে থাকো তবে আমার অনুগত হয়ে যাও, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন, আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু'। (সুরা আল ইমরান, ৩৯ আয়াত।)
আনুগত্যের এই কৌশল বাণীতে পবিত্র কোরান ঘোষনা করে যে, হাকীকতে মোহাম্মদী বা ইনছানে কামেলের আনুগত্যই আল্লাহর আনুগত্য। আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের জন্য আল্লাহ অনুরাগীর এই আনুগত্য একান্ত প্রয়োজন।
কিন্তু ইনছানে কামেল না চিনলে আনুগত্যের প্রশ্নই উঠে না। তাই প্রথমে কামেল ব্যক্তির পরিচয় অপরিহার্য্য, যা ছাড়া অনুকরন-অনুস্মরণ সম্ভবই নয় এবং অনুকরন ব্যতীত শিক্ষা-দীক্ষা হতেই পারে না। আল্লামা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী সাহেব তাজুলঅলী ছিলেন তা গাউছুল আজম মাইজভান্ডারীর (কঃ) একটি কেরামত বুঝা যায়। আল্লামা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী সাহেব নিজেই বর্নণা করেছেন যে একদা শীতের রজনীতে তিনি তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে উঠে অত্যন্ত শীত অনুভব করেন। তাঁর মনে আসল যে তাঁর বেয়াই হযরত সাহেব কেবলার নিকট ভক্ত অনুরক্তদের আনীত অনেক শাল ওমূল্যবান কাপড়াদি আনে, তাঁর নিকট সংবাদ পাঠাইলেই তিনি নিশ্চয়ই আমার জন্য শীত বস্ত্র পাঠাইয়া দিবেন। আমার আর খরিদ করতে হবে না। ঘটনাক্রমে সেই
রাত্রেই হযরত কেবলা নাজিরহাটে, আবদুর রহমান নামে এক ভক্তের দোকানে অবস্থান করছিলেন। হযরত শেষ রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাজের সময়ে তাঁর ভক্ত আবদুর রহমান মিয়াকে ডেকে হুকুম করলেন, আবদুর রহমান মিয়া একখানা বালাকোষ তৈয়ার করে রাখ। আবদুর রহমান মিয়া হযরতের আদেশ পালনার্থে সকালে একজন দরজী ডেকে একখানা বালাকোষ তৈয়ার করে হযরত আকদছের সমীপে হাজির করলেন। হযরত কেবলা উহার সমস্থ খরচ দিয়ে দিলেন। হাদিয়া রুপে লোকের আনিত দুইখানা শাল ও উক্ত বালাকোষ একজন লোক মারফত সন্ধ্যায় তাঁর বেয়াই, জনাব মওলানা সৈয়দ মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী সাহেবের নিকট প্রেরণ করেন। মওলানা মির্জাপুরী সাহেব হযরতের পাঠানো বালাকোষ ও শাল কাপড় দেখে অবাক হয়ে গেলেন। এবং গত রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাজের সময় তিনি মনে মনে যা চিন্তা করেছিলেন, তা কারো নিকট ব্যক্ত করেননি। অথচ হযরত কেবলা তাঁর জন্য এ ধরনের কাপড়ই পাঠালেন, যা তিনি মনে মনে আশা করেছিলেন। এতে বুঝা যায়
অলিই অলিগণকে চিনে। এ মহান অলি ও যুগশ্রেষ্ঠ আলেম এর পবিত্র মাজার শরীফ হাটহাজারী থানার অন্ত গত মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত। প্রত্যহ অনেক লোক তাঁর পবিত্র মাজার হতে ফয়েজ বরকত হাছেল করেন। প্রতি বৎসর ৪ঠা চৈত্র তাঁর বার্ষিক ওরশ শরীফ রওজা প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়। এ মহান অলির ফয়েজ ও বরকত আমাদের উপর বর্ষিত হউক। আমীন।


No comments