অছিয়ে গাউসুল আজম মাইজভান্ডারীর শিক্ষক কে ?
হযরত মওলানা শাহছুফী হাফেজক্বারী মোহাদ্দেছ হেকিম সৈয়দ তোফাজ্জল হোসাইন আল-মাইজভাণ্ডারী (রঃ) হাটহাজারী থানার অন্তর্গত মির্জাপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পীর বংশে ১৮৫০ ইংরেজী সনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম সৈয়দ আলিম উল্লাহ। তিনি একজন বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। পিতার নিকট ছোট কালে আরবী শিক্ষা গ্রহন করেন ও কোরান হেফজ করেন। তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রাম শহরে মোহছেনীয়া মাদ্রাসা ছাড়া অপর কোন বড় মাদ্রাসা না থাকায় তাঁকে মোহছেনীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়েছিল। সেখান থেকে তাঁর পিতা আরও উচ্চ শিক্ষার জন্য কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় প্রেরণ করেছিলেন। সেখান হতে একদিকে কোরানে হাফেজ ও কারী, অপরদিকে কোরান শরীফ তফসীর, হাদিস, ফিকাহ, মাস্তেক, হেকমত, বালাগত, আকায়েদ প্রভৃতি শাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। উচ্চ শিক্ষা শেষ করে কয়েক বছর মাদ্রাসায় মোহাদ্দেছ হিসেবে নিয়োজিত থেকে ১৮৮০-১৮৮১ সনে নিজ গ্রামে চলে আসেন। বাড়ীতে আসলে তাঁকে মির্জাপুর গ্রামের, মির্জাপুরী বড় মওলানা (কঃ) সাহেবের এক ভাইয়ের কন্যাকে বিবাহ করান। উক্ত ঘরে দুই পুত্র। একজন, মওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ ইসমাইল অপর পুত্র হযরত শাহছুফী সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ (রঃ) আল-কাদেরী, আল-মাইজভাণ্ডারী (যার রওজা মনিয়াপুকুর পাড় বাজারের উত্তর পার্শ্বে)। সৈয়দ মোহাম্মদ ইসমাইল তাঁর নানার বাড়ীতে অবস্থান করেছিলেন এবং ইন্তেকাল করেন। তিনি খুবই জ্ঞানী ছিলেন। হাফেজ সাহেবের প্রথম স্ত্রীর ইন্তেকালের পর তিনি বহুদিন বিবাহ করেননি। অনেকদিন পর ১৮৯৬ সালে মির্জাপুরী বড় মওলানা (কঃ) সাহেবের কন্যা শাহাজাদী সৈয়দা মাজেদা খাতুনকে বিবাহ করেছিলেন। তখন তিনি নিজ গ্রামে 'অল্প চৌধুরী' মসজিদে ইমামতি করতেন এবং বাড়ীর পশ্চিমের পাহাড়ী বন-জঙ্গল হতে গাছের ছাল, ডাল, লতা, পাতা ইত্যাদি এনে হেকিমী ঔষধ তৈরী করতেন। সেগুলো বিক্রয় করে নিজের পারিবারিক জীবন নির্বাহ করতেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঔরশজাত এক পুত্র সৈয়দ ছায়াদ উল্লাহ জন্ম গ্রহনের কিছুদিন পর একদিন হযরত শাহছুফী কুতুবুল আকতাব সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাভাণ্ডারী (কঃ) হাফেজ সাহেবের বাড়ীর পিছনের দিকে বাচা মিয়া চৌধুরীর বাড়ীর সম্মুখে পুকুরের দক্ষিণ পূর্বে খালি জায়গায় 'জগন্নাথ রোড'
সংলগ্ন স্থানে দলবল নিয়ে এসে বিশ্রাম করেন। এলাকার
লোকজন বাবাজান কেবলাকে খাওয়ানোর জন্য ঘরে রান্না করা যা কিছু ছিল তা নিয়ে এসেছিলেন। বাবাজান কেবলাকে দেখার জন্য বহু লোকের ভীড় হয়েছিল। বাবাজান ঐ এলাকার একজনকে একটা পানি সহ বদনা আনার জন্য বলেন। পানি সহ একটা বদনা এনে দিলে বাবাজান ঐ বদনার পানি দিয়ে ওজু করেছিলেন। উল্লেখ্য এইস্থানে পরবর্তীতে একটি মসজিদ নির্মিত হয়। সেই সময় হাফেজ সাহেব বাড়ীতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রীর দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল বাবাজান কেবলাকে একটু দেখার। বড় মৌলভী সাহেবের কন্যা বাড়ীর পিছন দিকে বেত ঝাড়ের মধ্যে গিয়ে নীরবে বাবাজান কেবলাকে এক নজর লুকিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। এমন সময় হাফেজ সাহেব বাড়ীতে এসেছিলেন। এসে দেখেছিলেন রান্না ঘরের চুলায় ভাতের হাঁড়ি আর ছোট ছেলে দোলনাতে কাঁদছে। তিনি সমস্ত গৃহ বিচরণ করে কাউকে কিছু না বলে তাঁহার স্ত্রীর অবস্থান কোথায় বুঝে ছেলেকে কোলে নিয়ে তাঁর শ্বশুর বাড়ীতে চলে যান। কিছুক্ষণ পর বাবাজান কেবলা ও তাঁর সংগে অনেক লোকজন সহ বড় মওলানা সাহেবের বাড়ীতে গিয়ে উঠেন। বড় মওলানা (কঃ) সাহেব বাবাজান কেবল আলমকে সাদরে গ্রহন করে উনার খাস কামরায় নিয়ে গিয়ে সম্মানের সাথে তাঁকে বৈঠকের ব্যবস্থা করে দিলেন। গৃহ হতে বাহিরে এসে দেখেন, তাঁর জামাতা হাফেজ সাহেব তাঁর ছোট শিশুকে নিয়ে তাঁর বাড়ীর দিকে চলে যাচ্ছেন। এই থেকে বুঝা যায় যে, হাফেজ সাহেব মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফকে তেমন ভাল মনে করতেন না। কিন্তু সে কথা বড় মওলানা সাহেবকে বলতে পারতেন না। কথা প্রসঙ্গে একদিন বড় মওলানা সাহেবকে তা বলে ফেললেন। তার উত্তরে বড় মওলানা সাহেব হাফেজ সাহেবকে বলেন যে, তিনি (বাবা ভান্ডারী) একজন বড় ধরনের অলি-আল্লাহ। তাঁর সম্পর্কে কিছু বলিওনা। তাঁকে বুঝতে হলে অনেক কিছু জানা দরকার। সব জান আল্লাহ সবাইকে প্রদান করেন না। তিনি যে রেয়াজত করেছেন, তাঁর বদৌলতে আল্লাহ তাঁকে অনেক উচ্চস্থানে নিয়ে গিয়েছেন। তিনি ফানা-ফিল্লা/বাকা-বিল্লা স্থানে অবস্থান করছেন।
এই ঘটনার পর তাঁর হৃদয়ের অনুভূতিতে ঝড় বইতে লাগল, রাত্রের স্বপ্নীল আভায় বিচলিত হন, যেন স্বর্গের এক হাতছানিতে। এরপর তিনি সাড়া না দিয়ে পারলেন না। মসজিদের ইমামতি ত্যাগ করে কোথায় চলে যান। তারপর বাড়ীর উত্তর দিকে, মরহুম আবদুল মজিদের পিতাহাজী বাচা মিয়ার মাধ্যমে জানতে পারলেন যে হাফেজ সাহেব মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে আছেন। হাফেজ সাহেবের পুত্র সৈয়দ ছায়াদ উল্লাহর মতে ১৮৯৮ সনে হাফেজ সাহেব দরবার শরীফে যান। হযরত গাউছুল। আজম শাহছুফি মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (কঃ)
মাইজভান্ডারীর হাতে বায়াত গ্রহণপূর্বক। ফয়েজ প্রাপ্ত হন এবং হযরতের খেদমতে দাখিল হন। তিনি হযরতের। নির্দেশে আছি-এ গাউছুল আজম হযরত মওলানা সৈয়দ দেলোয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারীর (কঃ) গৃহ শিক্ষক ছিলেন।
তিনি বহুদিন দরবার শরীফে হযরতের খেদমতে থেকে যান। বাড়ী ঘরের সংবাদ তেমন নিতেন না। মাঝে-মধ্যে বাড়ীতে আসতেন। হযরতের নির্দেশের বাহিরে তিনি চলতেন না। তিনি কম কথা বলতেন, বড় বড় ওয়াজ মাহফিলে হযরতের নির্দেশ মোতাবেক যেতেন। হযরতের বেছালের কয়েক বৎসর পর স্বপ্নয্যেগে আদিষ্ট হয়ে তিনি রওজা শরীফের খেদমত হতে বাড়ীতে চলে এসেছিলেন। এই স্বপ্নে হযরত কেবলা তাকে দুইটি মূল্যবান বস্তু প্রদান
করেন। তৎমধ্যে একটি হল একজোড়া "নালাইন শরীফ" (পাদুকা মোবারক)। তা এখনো তার বংশধরের নিকট রক্ষিত আছে। অপরটি 'কিমিয়া' এক প্রকার ফর্মূলাঃ যেটি এক প্রকার রসায়ন জাতীয় পদার্থের সমন্বয়ে স্বর্ণ তৈরীর ফর্মুলা। এই ফর্মুলা দ্বারা তিনি স্বর্ণ তৈরী করে দেখিয়েছিলেন। হাফেজ সাহেব এন্তেকালের পূর্বে হযরতের দরবারে গিয়ে হযরতের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী আছি-এ গাউছুল আজম হযরত শাহছুফী সৈয়দ দেলওয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারীর (কঃ) হাতে এই স্বর্ণ বানানোর ফর্মুলাটি দিয়ে এসেছিলেন। যেটি পরে হযরত সৈয়দ নুরুল বক্তেয়ার শাহ (রঃ) কে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও তা না রেখে তা পুনঃ ফেরৎ প্রদান করেছিলেন। উক্ত কিমিয়া রাখার মতো যোগ্য কেউ না থাকায় তা হযরতের রওজা শরীফে পুঁতে রাখা হয়। এই কথাটি বলেছিলেন সৈয়দ নূরুল বক্তেয়ার শাহ (রঃ)। অছি-এ গাউছুল আজম (কঃ) হাফেজ ছাহেব সম্পর্কে যে মন্তব্য করেনঃ যা জীবন বাতির ৯৯ সনের ৬ষ্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল, তা নিম্নরূপ:-
"আমার ওস্তাদ, মওলানা হাফেজ ক্বারী মোহাদ্দেছ জনাব তফাজ্জল হোসাইন মির্জাপুরী (রঃ) ছাহেব, হযরত কেবলার রওজা শরীফের খেদমত হতে অবসর হওয়ার পর বাড়ী মোকামে যাওয়ার পূর্বে আমাকে স্নেহ করে বলেছিলেন দেখ, যেই সময় তোমার সঙ্গে কথাবার্তা বলার লোক থাকবেনা সেই সময়ের জন্য নেক্কার বুজুর্গ হিসেবে এই কেতাবগুলি দিয়ে যাচ্ছি। আশা করি তোমার জন্য সহায়ক হবে। যে জন্য এই কেতাবগুলি জমা করেছি"। তাই অছি-এ গাউছুল আজম হাফেজ সাহেবের স্মৃতি
৩৫
রক্ষার্থে এই মূল্যবান তাছাওফ, ছুফীজ্ঞান সম্পন্ন, হাদিস, তফন্ত্রীর ফেকাহ, লোগাত বা শব্দকোষ, উর্দু, ফার্সী, আরবী বিভিন্ন ভাষায় রচিত, খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মনিষীগণের গ্রন্থাবলীর সমন্বয়ে 'তফাজ্জল মেমোরিয়াল লাইব্রেরী' নামে তাঁর স্মৃতি বিজড়িত এক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি এমন একজন কামেল অলি ছিলেন যা অছি-এ গাউছুল আজমের এই বাণী হতে বুঝা যায়। অছি-এ গাউছুল আজম ১৮৯৩ সনে জন্ম গ্রহন করেন। ১৯০২ সনে অছি -এ গাউছুল আজমের আব্বাজান হযরত শাহছুফী সৈয়দ ফয়জুল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) ইন্তেকাল করেন। তখন অছি-এ গাউছুল আজমের বয়স মাত্র ১০ বছর। ১৯০৬ সনে তাঁর অভিভাবক হযরত কেবলা ইন্তেকাল করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪ বছর। ১৮৯৮ সন হতে অছি-এ গাউছুল আজমের গৃহ শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত থেকে হাফেজ সাহেবকে যে বাতেনী জ্ঞান হযরত কেবলা আলম প্রদান করেছিলেন, সেই সমস্ত জ্ঞান সমূহ অছিয়ে গাউছুল আজমকে প্রদান করে সঠিক সময় ১৯১২ সনে হযরতের রাওজা শরীফের খেদমত হতে তিনি বিদায় নিয়ে আসেন।
হাফেজ ছাহেব এমন একজন অলি ছিলেন যাঁকে খুব সহজে কেউ বুঝতে পারতেন না। তাঁর জমানায় মছিহউল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) কে বড় মওলানা এবং তাঁকে ছোট মওলানা ডাকা হতো। ১৯২২ সনে ১২ই মোহররম, ৭ ই অগ্রহায়ন তিনি ইন্তেকাল করেন। তখন তার ছোট। ছেলে সৈয়দ মছউদউল্লাহ এর বয়স ছিল ৫ বছর, ছোট কন্যার বয়স ছিল ৩ বছর। ইন্তেকালের সংবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে দরবার শরীফেও সংবাদ দেওয়া হয়। অছি-এ গাউছুল আজম তাঁর নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন এবং তাঁর নির্দেশে নিদিষ্ট স্থানে দাফন কার্য সম্পাদন করেন। মাটির দেয়াল ছনের ছাউনিযুক্ত একটি দরগাহ নির্মাণ করেছিলেন। বাড়ীর জীবিত বৃদ্ধা মহিলা মরহুম সৈয়দ মোঃ হোসেন এর স্ত্রী বলেন যে, ঐ দরগাহ ১৯৪৩ সন পর্যন্ত ছিল। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে নষ্ট হয়ে যায় কারণ বাড়ীতে বড় কেউ ছিল না। মির্জাপুরী বড় মওলানা সাহেবের কন্যাও তাঁর ছোট মেয়ে নিয়ে বাড়ীতে ছিলেন। তখন তার বড় ছেলে সৈয়দ ছায়াদ উল্লাহ রেংগুন হতে এসে মাইজভান্ডার দরবার শরীফের খেদমতে ছিলেন ও ছোট ছেলে সৈয়দ মছউদউল্লাহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে উক্ত রওজা
একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। চারিদিকে বাঁশের ঘেরা দেওয়া ছিল মাত্র। ১৯৮১ সনে অছি-এ গাউছুল আজম, পুনরায় সৈয়দ মছিউল করিম মির্জাপুরী সাহেবের মাধ্যমে যে স্থানে হাফেজ সাহেবকে দাফন করা হয় সেই স্থানে বর্তমানে যে রওজার নমুনা আছে তা নিজ খরচে নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।


No comments