Header Ads

শরীয়ত ও তরিকতের নামাজ

 শরী'য়তের নামাযের ব্যাপারে তোমরা অবগত রয়েছো যে সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,


حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الوُسْطَى


-"তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হবে, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের। "২১০ এ নামায শরীরের প্রকাশ্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। যেমন: (কিবলামুখী হয়ে) দাঁড়ানো, কিরআত পাঠ, রুকু, সিজদা, বৈঠক, শব্দ ও উচ্চারণ। আর এ জন্যই উপরোক্ত আয়াতে নামাযের ফযীলত বর্ণনায় ।حافظ শব্দটি বহুবচনে এসেছে।


আর তরীকতের নামায হলো: অন্তরের নামায যা সার্বক্ষণিক হয়ে থাকে। এ নামাযে (আধ্যাত্মিক পীর মুরশিদগণকে) সর্বদা বিভোর থাকতে হয়। যা আয়াতটির দ্বারা জানানো হয়েছে। যেমন-


والصَّلَاةِ الْوُسْطَى


-"মধ্যবর্তী নামাযের (সংরক্ষণ কর)।"২১৪


এখানে মধ্যবর্তী নামাযের দ্বারা অন্তরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। কেননা কলব দেহের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। যা ডান ও বামের মধ্যবর্তী, ওপর ও নিম্নভাগের মধ্যবর্তী, সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। যেমন-আল্লাহর রাসূল এ ইরশাদ করেন-


وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : القلب بين أصبعين من أصابع الرحمن يقلبها كيف يشاء .


-"অন্তর দয়াময়ের (কুদরতী) আঙ্গুলসমূহের দুই আঙ্গুলের মাঝে অবস্থিত। তিনি যেভাবে ইচ্ছা এ অন্তরকে পরিবর্তন করেন। "২১৫


এখানে দুই আঙ্গুলের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: মহান আল্লাহর ক্রোধ ও দয়ার গুণ। কেননা তিনি এরূপ আঙ্গুলের সদৃশ্য থেকে পবিত্র। অতএব উপরোক্ত আয়াত ওহাদীসের দ্বারা জানা গেল যে, অন্তরের নামাযই হলো আসল নামায়। কেননা বান্দা যখন তার অস্তরের নামায থেকে উদাসীন হয়ে যায়, তখন তার প্রকাশ্য ও আত্মিক দুই নামাযই নষ্ট হয়ে যায়। যেমন: আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করেন,


لَا صَلَوةَ إِلَّا بِحُضُورِ الْقَلْبِ


-"হুযুরী কলব (একাগ্রচিত্ত) ব্যতীত নামায হয় না।”২১৬


২১৬ (আল্লামা ইমাম ইউছুফ ইবনে মূছা ইবনে মুহাম্মদ জামালুদ্দিন হানাফী (রঃ ) ওফাত


৮০৩ হিজরী: আল মু'তাছার মিনাল মুখতাছার মিন মুশকিলিল আছার المعتصر من المختصر من مشكل الآثار হযরত আম্মার ইবনে ইয়াছার রাঃ থেকে, ১ম খন্ড, ৪২ পৃষ্ঠা;(


এ বিষয়টির সমর্থনে অনেকগুলো বর্ণনা এসেছে, যেমন-


عن أبي سعيد قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا صَلَاةَ لمن لا يتخشع في صلاته -"হযরত আবু সাঈদ খুদরী (খ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রসুলে পাক() ইরশাদ করেন, যার নামাজে খুশু তথা হুজরী জ্বাল্ব নেই, তার কোন নামায নেই।” (ইমাম সুয়তি, জামেউল আহাদিস, ৮/২৯১ পৃ. হা/১৭১৫৩; ইমাম দায়লামী, আল-মুসনাদিল ফিরদাউস,


হা/৭৯৩৫; আল্লামা মুত্তাকী হিন্দী, কানযুল উম্মাল, ৭/২১৩ পৃ. হা/২০০৮৮)


অপর এক হাদিসে এসেছে-


عن أبي بْنِ كَعْبٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يُقْبَلُ مِمَّنْ عَمِلَ عَمَلًا حَتَّى


يَشْهَدَ قَلْبُهُ مَعَ بَدَنِهِ


-"হযরত উবাই ইবনে কা'ব (৯) হতে বর্ণনা করেন, রাসূলে পাক (3) বলেছেন: আল্লাহ তা'আলা ঐ নামাজের দিকে নজর করেন না যে ব্যক্তির নামাজে দেহের সাথে ক্বাল্ব হাজির থাকেনা।" (ইমাম দায়লামী, মুসনাদিল ফিরদাউস, হা/৭৯৩৫; ইমাম হাফিজ যায়নুদ্দিন ইরাকী, শরহু তাছরীব ফি শরহে তাকরীব, ২/৩৭২ পৃ., ইমাম মুহাম্মদ ইবনু নছর আল-মারুজী, কিতাবুছ ছালাত, হা/১৫৭; ইমাম গাযযালী, ইহইয়াউল উলূমুদ্দিন, ১/২০১ পৃ.)


হাফিজুল হাদিস, ইমাম মুনযিরী (প্রস্ত্র) বলেন,


وَعَن عُثْمَان بن أبي دَهْرَشٍ رَضِي الله عَنْهُ عَنِ النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ لَا يُقْبَلُ مِمَّنْ عَمِلَ عَمَلًا حَتَّى يَشْهَدَ قَلْبُهُ مَعَ بَدَنِهِ


رَوَاهُ مُحَمَّدُ بْنُ نَصْرِ الْمَرْوَزِي فِي كِتَابِ تَعْظِيمِ قَدْرِ الصَّلَاةِ هَكَذَا مُرْسَلًا وَوَصلَهُ أَبُو مَنْصُورٍ الديلمي في مسند الفردوس بأبي بن كعب والمرسل أصح


-"হযরত উসমান ইবনে আবী দাহরিশ (২) নবী করিম() হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল (ব্লু) বলেছেন, আল্লাহ পাক ওই ব্যক্তির আমলকে কবুল করেন না যতক্ষণ না তার দেহের সাথে জ্বালব হাজির না থাকে। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে নাছর মারওয়াজী তাঁরবান্দা নামাযের ভিতর তার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করে থাকে। আর প্রার্থনার কেন্দ্রবিন্দু হলো অন্তর। তাই অন্তর যখন ওই নামায থেকে উদাসীন হয়ে যাবে তখন অন্তরের নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর তার সঙ্গে বাহ্যিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নামায়ও বাতিল হয়ে যাবে। এটা এজন্য যে, অন্তর হলো কেন্দ্রবিন্দু; অন্যসব তার অনুগামী। যেমন- আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করেন-


إنَّ فِي جَسَدِ ابْنِ آدَمَ مُضْغَةً فَإِذَا صَلُحَتْ صَلَحَ الجَسَدُ كُلُهُ وَإذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الجَسَدُ كُلُّهُ ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ


ভাত المه


-"(মানুষের) শরীরে একখণ্ড মাংসপিণ্ড রয়েছে। যখন সেটা ঠিক থাকে তখন সমস্ত শরীর ঠিক থাকে। আর যখন ওই মাংসপিণ্ড কলুষিত হয়ে যায়, তখন সমস্ত শরীর কলুষিত হয়ে যায়। আর সেই মাংসপিণ্ড হলো কলব।"২১৭


عر


শরী'য়তের নামায প্রত্যহ দিবারাতে পাঁচবার আদায় করতে হয়। আর মসজিদে জামা'আতে ইমামের অনুসরণে কিবলামুখী হয়ে আদায় করা সুন্নাত বলে গণ্য; যাতে কোনরূপ লোক দেখানো ও লোকশুনানো মনোভাব থাকতে পারবে না।


পক্ষান্তরে তরীকতের নামায মানুষের সমগ্র জীবনে আদায় করতে হয়। এ নামাযের মসজিদ হলো মানুষের অন্তর। এর জামাআত হলো (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের) বাতিনী শক্তির সাথে মিলিত হয়ে বাতেনী জিহ্বা দ্বারা মহান আল্লাহর তাওহীদী নামের স্মরণে বিভোর থাকা। এ নামাযের ইমাম হলো অন্তরে মহান আল্লাহর প্রেম। তার কিবলা হলো একক সত্তা মহান আল্লাহ ও তাঁর অমুখাপেক্ষী সৌন্দর্যতা। এটাই হলো আসল কিবলা। কলব ও রূহ উভয়ে সর্বক্ষণ এ নামাযে বিভোর থাকে। কলব কখনো ঘুমায় না ও মৃত্যুবরণ করে না। কোন প্রকার শব্দ, দাঁড়ানো ও বৈঠক ব্যতীতই অন্তরের জীবনীশক্তি দ্বারা সে এ নামাযে বিভোর থাকে। মহান আল্লাহর ওই বাণী দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। যেখানে তিনি ইরশাদ করেন



'কিতাবু তা'জিমু কাদরিস সালাত' গ্রন্থে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন, ইমাম আবুল মানসুর দায়লামী (এ) তাঁর 'মুসনাদিল ফিরদাউস' গ্রন্থে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (এ) থেকে বর্ণনা করেছেন। মুরছাল রেওয়ায়েতটি অধিক সহীহ।” (ইমাম মুনযিরী, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৭৬৯)


২১৭. আল্লামা ইসমাইল হাক্কী, তাফসিরে রুহুল বায়ান, ৬/১২৪ পৃ.

نَسْتَعِينُ


-"আমরা শুধু তোমারই উপাসনা করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। ২১৮


রাসূল আ'র পূর্ণ অনুসরণেই এ জাতীয় নামায আদায় করা হয়। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে বায়যাবীতে রয়েছে, এ আয়াতে (আধ্যাত্মিক) আরিফগণের বিশেষ অবস্থা এবং তাদের অনুপস্থিত অবস্থা থেকে মহান প্রভুর দরবারে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টির ইঙ্গিত রয়েছে। আর এ জন্যই তাঁরা এমন সম্বোধনের যোগ্যতা পেয়েছেন। যেমন- আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করেন


الأنبياء والأَوْلِيَاءُ يُصَلُّوْنَ فِي قُبُورِهِمْ كَمَا يُصَلُّونَ فِي بُيُوتِهِمْ


-"নবি ও অলিগণ তাদের (ইন্তিকালের পর) তাদের গৃহের ন্যায় স্বীয় রওযাতে নামায আদায় করে থাকেন।"২১৯


অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের জীবন্ত আত্মার মাধ্যমে তাদের প্রতিপালকের প্রার্থনায় রত থাকেন।


অতএব বাহ্যিক ও বাতেনী এ দুই প্রকার নামায যখনই একত্রিত হবে, তখনই নামায পূর্ণতা লাভ করবে। এরূপ নামাযের প্রতিদান অপরিসীম অর্থাৎ রূহানীভাবে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং শারিরীকভাবে মযার্দা (বেহেশত) লাভ। এরূপ ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে একজন আবেদ এবং আধ্যাত্মিক বিবেচনায় একজন আরিফ বলে গণ্য হন। আর যখন জীবন্ত কলবের দ্বারা আত্মিক সালাত পূর্ণতা পাবে না, তা হবে ত্রুটিপূর্ণ সালাত। যার ফলে পরকালে সে শুধুমাত্র দৈহিক মর্যাদাই লাভ করবে। আল্লাহর নৈকট্যের মর্যাদা পাবে না।


No comments

Powered by Blogger.